মুঠোফোন আর করিতকর্মাভাষ

আজ একটি নতুন বাংলা শব্দের সঙ্গে পরিচয় হল আমার -“মুঠোফোন”।  নিজে কোনদিন ব্যবহার করিনি। বাংলাদেশের একটি দৈনিক পত্রিকা পড়তে পড়তে এই শব্দটি আমার চোখে পড়ল। আন্দাজ করে বোঝা যায় যে মুঠোফোনের  মানে, যে বস্তুটিকে  (আমি অন্তত) বাংলায় এতদিন ধরে মোবাইল (বা সেলফোন) বলে এসেছি। পশ্চিমবঙ্গের বাংলায় ব্যবহার হয় কী এই শব্দ? শুনিনি কখনো।  গুগল-এ অনুসন্ধান করে দেখলাম এই শব্দের দেখা মেলে প্রায় ৪ লাখ পৃষ্ঠায়, যার থেকে বোঝা যায় যে অন্তত বাংলাদেশে এই বাংলা শব্দটি প্রচলিত। কিন্তু পরের মূহুর্তে নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী অনুসন্ধান করে জানলাম যে অধিকাংশ পৃষ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে ২০০৬-এর পরে। তার আগে ইন্টারনেটে ‘মুঠোফোন’ শব্দের খুব বেশি ব্যবহার হয়নি। হয়ত মুঠোফোন বস্তুটির ব্যাবহারের হারের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। শব্দটা মুঠোফোন হ’ল কেন সেই নিয়ে আমার কিঞ্চিত কৌতুহল আছে। সরাসরি অনুবাদ করা হয়নি সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে – না হলে চলন্তফোন, প্রকোষফোন, বা যানফোন ব্যবহার করা যেতে পারত। আর ফোন বা টেলিফোনের পরিবর্তে দূরভাষ ব্যবহার করতে বাধা কোথায়? তাহলে কী দাঁড়ায়? মুঠোভাষ! আর স্মার্টফোন কে বলা যেতে পারে পটুভাষ বা করিতকর্মাভাষ (দ্বিতীয়টি আমার বেশি পছন্দের)।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে আমি কোনদিন ইন্টারনেটাকে ‘আন্তর্জাল’ বলিনি যদিও ‘আন্তর্জাল পর্যটক’ এবং  ‘আন্তর্জাল সার্ফার’ ব্যবহার করেছি ছদ্মনাম হিসেবে।

Advertisements

শাহবাগ সম্পর্কে কয়েকটা কথা

সুদূর আমেরিকা থেকে বিগত এক মাস ধরে আমি রুদ্ধশ্বাসে বাংলাদেশের শাহবাগের আন্দোলন নিরীক্ষণ করছি। আমার জীবদ্দশায় সম্ভবত বাঙালী জাতির একাংশ কোন একটি বিষয়ে এত তত্পরতা দেখিয়েছে বলে মনে হয়না। এই আন্দোলনের বিষয় অনেক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অনেক বাংলাদেশী তাঁদের মত জ্ঞাপন করেছেন। আমি শাহবাগের ‘প্রজন্ম চত্বর’ কোনদিন দেখিনি কিন্তু আমারও এই আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বলতে ইচ্ছে করে। তবে তার আগে আমার নিজের বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার। আমার পরিচয় পেয়ে অনেকেই আমার বক্তব্য যুক্তিহীন বলে উড়িয়ে দিতে পারবেন জেনেও সেটা দেওয়া আমার কর্তব্য মনে করি।

আমি বাংলাভাষী, বাংলা ভালবাসি, কিন্তু বাংলাদেশী নই। কোনো কালেই আমার কোনো পূর্বপুরুষ (অথবা  পূর্বনারী) বাংলাদেশ, পূর্ব পাকিস্তান, বা পূর্ববঙ্গে বসবাস করেননি। সম্পুর্ণ অরাজনৈতিক সংজ্ঞায় ১৯৪৭ সালের আগে সাহিত্যিকরা যে বাংলাদেশের কথা লিখে আমাদের সমবেত ভাষা সমৃদ্ধ করে গেছেন, কেবল সেই অর্থের বাংলাদেশ আমার পূর্বপুরুষরা দেখেছেন। যে দুটি দেশে আমি দীর্ঘদিন কাটিয়েছি- ভারত এবং আমেরিকা – বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রনীতির মধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রকাশ করেছে। তবে সেই বিষয় আরেকদিন আলোচনা করা যেতে পারে। ইচ্ছে হলে বাংলাদেশী পাঠক এখানেই পড়া বন্ধ করতে পারেন।

যে দেশের নাগরিক আমি নই এবং যে শাহবাগের আন্দোলনের উপর আমার কোনো অধিকার নেই, সেই বিষয়-এ আমার কেন কিছু বলার স্পর্ধা হল?

এটা ঠিক যে আমি বাংলাদেশী না হলেও বাংলাদেশের অনেক মানুষের সংস্পর্শে এসেছি, তাঁদের শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। তাঁদের দেশের ইতিহাস, সঙ্গীত, সাহিত্য এবং সংস্কার সম্পর্কে আমার কিছুটা জ্ঞান লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে। অনেক কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, সঙ্গীত-শিল্পীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। বলতে বাধা নেই, যে সেটা অনেকখানি সম্ভব হয়েছে আমাদের মাতৃভাষা এক বলে। বাংলা ভাষা ভালবাসি বলেই হয়ত জাহানারা ইমামের জীবনীর অংশ, বা শামসুর রহমানের কবিতা, বা লালন সাঁই-এ গান আমার এতখানি প্রিয়।

কিন্তু আজ যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার বাংলাদেশ। শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হলেও আমি স্পষ্ট বুঝি যে শাহবাগ মনুষ্যত্বের দাবি। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি শুধু অতীতের দিকে চেয়ে একটি লঘু দাবি নয়। এটা একটি জাতির সুন্দর আগামীকাল গড়ার দাবি। তাই আজ বলতে আমার মনে এতটুকু দ্বিধা নেই যে লাখো মানুষের স্রোতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বত:স্ফুর্ত দাবির গর্জন আমার হৃদয় ছুঁয়েছে।

আর আমার যেটা মনে হয়েছে সব থেকে বড় কথা, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি বাংলাদেশীদের আত্মপরিচয় ফলাও করার দাবি। এখানে ‘বাংলাদেশী’ শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ভারতীয় বাঙালী আছেন, বিশেষত যাঁদের আদি ঘর “ওপারে,” যাঁরা গভীর স্নেহের সঙ্গে এবং একটা রোমান্টিক আবেগজড়িত সম্ভাবনার চোখে তাঁদের পূর্বপুরুষদের দেশের দিকে চেয়ে থাকেন। আমি সেই আবেগ শ্রদ্ধা করি কিন্তু আমি নিজে সেই আবেগ থেকে বঞ্চিত। আগেই বলেছি যে আমার পারিবারিক কোনও টান নেই বাংলাদেশে। আমি মনে করি বাস্তবরূপে সেই “ওপারের” সমাপ্তি ঘটেছে ১৯৪৭ সালে। ভাষা আন্দোলনের ফলে, গণহত্যার ভয়াবহ অন্ধকারের মধ্যে যুদ্ধে জয়লাভের ফলে, এবং স্বাধীন দেশের একের পর এক সরকারের সম্ভাবনা এবং হতাশাপূর্ণ কার্যকলাপের মাধ্যম-এ গড়ে উঠেছে এক সম্পুর্ণ ভিন্ন পরিচয়ের দেশ এবং মানুষ। যেখানে ১৯৪৭ সালে ছিল বাংলার পূর্বভাগের বাঙালী, সেখানে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন পরিচয়ের স্বতন্ত্র বাংলাদেশী যাঁর আত্মপরিচয়ের পূর্ণ রূপ পাওয়া যায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। উল্লেখ্য, যে অনেক ভারতীয় বাঙালী বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার সঙ্গে পরিচিত থাকলেও, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালের বাকশাল-এর ভরাডুবির কথা জানেন না।

আবার ফিরে আশা যাক শাহবাগ এবং বাংলাদেশের কথায়। বলা বাহুল্য, অনেক বাঙালী আছেন যাঁরা বাংলাদেশী নন। আবার বাংলাদেশে, বাঙালী ছাড়াও অন্য জাতির অনেক মানুষ বসবাস করে থাকেন। উপরন্তু, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম হলেও, বাংলাদেশের মুসলিম দেশ বলে পরিচয়ের একমাত্র দিক হতে পারেনা। বিশ্বের অনেক দেশ-ই মুসলিম প্রধান – যদি বাংলাদেশীদের পরিচয় শুধুই প্রধান গোষ্ঠীর ধর্মে তবে অনান্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য কোথায়? আর তা ছাড়া, শুধু এই পরিচয় তুলে ধরলে সমধর্মী পাকিস্তানীদের বর্বরোচিত আচরণের কথা ভুলে যেতে হয়, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের অবমাননা করতে হয়।

আমার এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই – কোনো ভাবেই ‘বাঙালী’ এবং ‘বাংলাদেশী’ সমার্থক শব্দ মনে করা যেতে পারে না। আবার কোনো ভাভেই বাঙালী মুসলিম আর বাংলাদেশী সমার্থক শব্দ হতে পারে না কারণ অনেক বাঙালী মুসলিম আছেন যাঁরা বাংলাদেশী নন।

এর সঙ্গে শাহবাগের কী সম্পর্ক? অনেক পশ্চিমী প্রচারমাধ্যম শাহবাগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের  আন্দোলনটাকে রক্তপিপাসা বা জিঘাংসামূলক প্রচেষ্টা বলে তুলে ধরেছেন। সহস্র মানুষের ভিড়ে কার কী ইচ্ছে তা কারুর পক্ষে নির্দিষ্ট ভাবে বোঝা সম্ভব নয়- কিন্তু যে রূপ ফুটে উঠেছে এক মাসে তা নিশ্চয় আমার মতন অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষের নজরেও পড়েছে! একমাস আমার বাংলাদেশী বন্ধুদের সংযত অথচ দৃঢ় কণ্ঠ শুনে মনে হয়েছে যে শাহবাগ জিঘাংসার দাবি নয়, বরং ন্যায়ের দাবি, এবং বৃহত্তর মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি শান্তিপূর্ণ, বিনম্র আবেদন।

প্রচারমাধ্যমের একাংশ শাহবাগের আন্দোলনটাকে ধর্মবিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে ধর্মবিমুখ নাস্তিকরা কেবল অংশগ্রহণ করেছেন। আমি জানি এই গুজব একেবারে মিথ্যে কারণ আমার পরিচিত অনেক ধর্মপরায়ন বাংলাদেশী শাহবাগে গেছেন এই কয়েক সপ্তাহে। আর হলই বা কেউ মুসলিম, বা কাফির, বা নাস্তিক। শাহবাগ সেই প্রশ্ন করেনা, সেই বিষয়ে শাহবাগের মাথা ব্যাথা নেই। ধর্ম ভ্রষ্ট করতে লাখো মানুষ একত্রিত হয়নি।

তাহলে শাহবাগ কী বলে?

শাহবাগ একটি রাষ্ট্রের মানুষের তাঁদের দেশের শত্রুদের বিচারের মধ্যমে দেশের প্রতি বিশ্বাস কায়েম রাখার প্রতীক। শাহবাগ বলে, যাঁরা দেশের উদয়কালে মানুষের আশা পিষিয়ে দেবার জন্য গণহত্যা পর্যন্ত করতে পিছপা হননি এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতাবিরোধী আচরণ করে এসেছেন, তাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন দেশবাসীর সঙ্গে। শাহবাগ বলে প্রত্যেক ‘রাজাকার’ যুদ্ধাপরাধী, কারণ যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীকালে তাঁরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করেছেন।

আমি যা বুঝেছি, শাহবাগের আন্দোলন বলে- যদি বাংলাদেশ এক অনন্য অবিভাজ্য দেশ, তবে তার প্রধান কারণ যুদ্ধের মধ্যমে দেশের মুক্তিলাভ করা। আর দেশের মধ্যে বসে থেকে এই ইতিহাস অবহেলা করা দেশবাসীর পরিচয় অসম্মান করার সমান।

আমি বাংলাদেশী নই বটে, কিন্তু আরেক স্বাধীন দেশের মুক্ত মানুষ হিসেবে আমি এই বিচারবোধ অবশ্যই শ্রদ্ধা করতে পারি।